পৃথিবী ডিম্বাকার নাকি গোলাকার?

ওয়ালি উল্লাহ সিরাজ: পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেণ, আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি, তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি, আর আমি তাতে সব কিছু উদ্গত করেছি সুপরিমিতভাবে। [সুরা : হিজর, আয়াত : ১৯ (প্রথম পর্ব)]

তাফসির : আগের কয়েকটি আয়াতে ঊর্ধ্বাকাশে আল্লাহর অসীম কুদরতের কিছু নিদর্শন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। আলোচ্য আয়াত থেকে কয়েকটি আয়াতে পৃথিবীতে আল্লাহর নিদর্শন বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ এ পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন।

পৃথিবী ডিম্বাকার, গোলাকার, নাকি সমতল—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্যের আগে পৃথিবীর কাঠামো সম্পর্কে কোরআনের আয়াতগুলো গভীরভাবে পাঠ করা জরুরি। নিচে আয়াতগুলো উদ্ধৃত করা হলো

এক. আলোচ্য আয়াতে রয়েছে, ‘আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি…। ’ (সুরা : হিজর, আয়াত : ১৯)

দুই. ‘আমি (আল্লাহ) বিস্তৃত করেছি ভূমিকে। তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা এবং এতে উদ্গত করেছি নয়ন-প্রীতিকর সব ধরনের উদ্ভিদ। ’ (সুরা : ক্বফ, আয়াত : ৭)

তিন. ‘তিনিই (আল্লাহ) ভূতলকে বিস্তৃত করেছেন এবং তাতে পর্বত ও নদী সৃষ্টি করেছেন…। ’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ৩)। এ তিন আয়াতে পৃথিবীর কাঠামো বোঝাতে ‘মাদ্দা’ বা ‘মাদাদ্না’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

কোরআনের অনুবাদকরা এখানে ‘বিস্তৃত করা’র অর্থ গ্রহণ করেছেন। এ শব্দের মূল অর্থ কোনো কিছু টেনে লম্বা করা। ‘বিস্তৃত করা’র অর্থে আরবি ভাষায় ‘বিসাত্ব’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। সরাসরি এ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে পরের আয়াতে।
চার. ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য ভূমিকে বিস্তৃত করেছেন। ’ (সুরা : নুহ, আয়াত : ১৯)। এ আয়াতে পৃথিবীর বিস্তৃতি বোঝাতে ‘বিসাত্ব’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। বিস্তৃত করার কাছাকাছি শব্দ ছড়িয়ে দেওয়া। এ শব্দের জন্য আরবিতে ব্যবহৃত হয় ‘সাত্বহুন’। এ শব্দও পবিত্র কোরআনে এসেছে। দেখুন পরের আয়াতে।

পাঁচ. ‘তবে কি তারা দৃষ্টিপাত করে না ভূতলের দিকে, কিভাবে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে?’ (সুরা : গাশিয়া, আয়াত : ২০)। এ আয়াতে পৃথিবীর বিস্তৃতি বোঝাতে ‘সুত্বিহাত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

ছয়. ‘আমি কি করিনি ভূমিকে শয্যাসদৃশ?’ (সুরা : নাবা, আয়াত : ৬)। এ আয়াতে পৃথিবীর কাঠামো বোঝাতে ‘মিহাদ’ অর্থাৎ শয্যা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

সাত. ‘আর ভূমি, আমি (আল্লাহ) তাকে বিছিয়ে দিয়েছি। আমি কত সুন্দর প্রসারণকারী। ’ (সুরা : জারিয়াত : আয়াত : ৪৮)। এ আয়াতে পৃথিবীর কাঠামো বোঝাতে ‘ফিরাশ’—বিছানা বা কার্পেট শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে যে এখানে রূপক অর্থে জমিনকে বিছানা বা কার্পেট বলা হয়েছে।

আট. ‘এরপর তিনি (আল্লাহ) পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন। ’ (সুরা : নাজিআত, আয়াত : ৩০)

শেষোক্ত আয়াতটি সর্বাধিক তাৎপর্যমণ্ডিত। এখানে পৃথিবীর বিস্তৃতি বোঝাতে ‘দাহা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অনুবাদকরা এখানেও ‘বিস্তৃত করা’র অর্থ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এটি তার মূল অর্থ নয়। বাংলা ভাষায় যাঁরা পবিত্র কোরআন অনুবাদ করেছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলা যায়, এ আয়াতে তাঁরা যে অনুবাদ করেছেন, তা যথার্থ হলেও পরিপূর্ণ নয়। এ শব্দের উৎপত্তি ও ব্যবহার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে আরবি ভাষার প্রাচীন ও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য অভিধান ‘লিসানুল আরব’-এ। সেখানে রয়েছে, ‘দাহ্উন’ শব্দটি যেভাবে বিস্তৃতি অর্থে ব্যবহৃত হয়, একইভাবে কোনো গোলাকার বস্তু নিয়ে খেলা করা অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এ শব্দমূল থেকে এসেছে ‘আদহা’ ও ‘ইদহা’। এর অর্থ কবুতরের ডিম। কিন্তু এসব কথা কোরআনের অনুবাদে আনা সম্ভব নয়। তাই শুধু কোরআনের অনুবাদ পাঠ করে আয়াতের মর্মোদ্ধার ও অন্তর্নিহিত দর্শন উপলব্ধি করা সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।

0 Response to "পৃথিবী ডিম্বাকার নাকি গোলাকার? "

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন